তারাবি নামাজ কতো রাকাত, ২০ রাকাত নাকি ৮ রাকাত

আরবি ‘তারাবিহ’ শব্দটির মূল ধাতু ‘রাহাতুন’ অর্থ আরাম বা বিশ্রাম করা। তারাবি নামাজ পড়াকালে প্রতি দুই রাকাত বা চার রাকাত পরপর বিশ্রাম করার জন্য(এ বিশ্রামে তারাবির দোয়া ও মোনাজাত, দোয়া দুরুদ পড়বেন) একটু বসার নামই ‘তারাবি’। দীর্ঘ নামাজের কঠোর পরিশ্রম লাঘবের জন্য প্রতি দুই রাকাত, বিশেষ করে প্রতি চার রাকাত পর একটু বসে বিশ্রাম করে দোয়া ও তসবিহ পাঠ করতে হয় বলে এ নামাজকে ‘সালাতুত তারাবিহ’ বা তারাবি নামাজ বলা হয়।

জেনে নেই তারাবি নামাজ ২০ রাকাত নাকি ৮ রাকাত

পবিত্র রমজান মাসের রাত্রিকালে এশার নামাজের ৪ রাকাত ফরজ এবং ২ রাকাত সুন্নতের পর বিতির নামাজের আগে যে নামাজ পরা হয় তাকে তারাবির নামাজ বলে।রমজান মাসের জন্য নির্দিষ্ট তারাবি নামাজ জামাতে পড়া ও সম্পূর্ণ কোরআন শরিফ একবার খতম করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা।

এ তারাবি নামাজ কতো রাকাত পড়তে হবে এ নিয়ে চলছে তুমুল বাকযুদ্ধ। কেউ বলছে ২০ আবার কেউ বলছে ৮ রাকাত। চলুন আল্লাহ নবী/ রাসূলের রেখে যাওয়া কুরআন এবং হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ করে দেখি তারাবি নামাজ কতো রাকাত পড়া সঠিক।

তারাবি নামাজ আট নয় বরং বিশ রাকাত হিসেবেই প্রমাণিত। কেউ কেউ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ২০ রাকাত তারাবি বিষয়ক হাদিসটিকে সূত্রের বিচারে অনির্ভরযোগ্য প্রমাণ করলেও; বিশুদ্ধ সূত্রে সাহাবায়ে কেরামের আমলই প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে সাহাবায়ে কেরাম বিশ রাকাতের শিক্ষা পেয়েছেন।কারন আমিরুল মুমিনীন হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকাল থেকে অবিচ্ছিন্ন কর্মধারায় এখন পর্যন্ত মক্কা শরিফের মসজিদুল হারাম ও মদিনা শরিফের মসজিদে নববীসহ সকল মসজিদে বিশ রাকাত তারাবি পড়া হয়। এ দীর্ঘ সময়ে কোথাও আট রাকাত তারাবির প্রচলন ছিল না সুতরাং বিশ রাকাত তারাবি-ই সঠিক।

সর্বপ্রথম ১২৮৪ সালে ইসলামের ভাইরাস নামে পরিচিত আহলে হাদিসরা আমাদের ভারতবর্ষে আট রাকাতের ফতোয়া দিয়ে উম্মাহের ঐক্যমত্যপূর্ণ মাসয়ালায় বিভক্তি সৃষ্টি করেন। তখন অন্যান্য আহলে হাদিসরাও তার বিরোধিতা করেছে। অতঃপর আরবের বা সেীদি আরবের কতিপয় বিচ্ছিন্ন আলেমও তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। কিন্তু আরববিশ্বের আলেমদের বেশিরভাগই বিশ রাকাত তারাবির আদায় করেন।

হজরত উমর (রা.)-এর যুগ থেকে ২০ রাকাত তারাবিহ

২০ রাকাত তারাবিহ
২০ রাকাত তারাবিহ

ইয়াজিদ ইবনে খুসাইফা (রহ.) বলেন, সাহাবি সায়েব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বলেছেন, সাহাবায়ে কেরাম হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবি পড়তেন। তিনি আরও বলেন, তারা নামাজে শতাধিক আয়াতবিশিষ্ট সূরাসমূহ পড়তেন এবং হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর যুগে দীর্ঘ নামাজের কারণে তাদের (কেউ কেউ) লাঠিসমূহে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন। -আস সুনানুল কুবরা ও বাইহাকি, ২/৪৯৬/৪২৮৮

অপর সূত্রে সাহাবি সায়েব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বলেন, আমরা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে বিশ রাকাত এবং বিতর পড়তাম। -আস সুনানুল কুবরা, বাইহাকি- ১/২৬৭-২৬৮

তাবেঈ ইবনে আবি যুবাব (রহ.) বলেন, হজরত উমর (রা.)-এর যুগে রমজানের কিয়াম তথা তারাবি ছিল ২৩ রাকাত। -মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস: ৭৭৩৩

হাদিসটির সূত্র বিশুদ্ধ। এতে ২৩ রাকাত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ২০ রাকাত তারাবি ও তিন রাকাত বিতর।

তাবেঈ আবদুল আজিজ ইবনে রুফাই (রহ.) বলেন, উবাই ইবনে কাব (রা.) রমজানে মদিনায় লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবি এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ২/২৮৫/৭৭৬৬

উবাই ইবনে কাব (রা.) মসজিদের এক কোনায় মানুষদের নিয়ে জামাতে তারাবিহ নামাজ পড়তেন। তার কারন ছিলো অনেকেই সূরা সহিহ শুদ্ধ ভাবে পড়তে পারতেন নাহ সেজন্য যারা কুরআন শরীফ পড়তে পারতেন নাত তাদেরকে নিয়ে উবাই ইবনে কাব জামাতে তারাবিহ নামাজ আদায় করতেন। এবং তখন মসজিদে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে নামাজ আদায় হতো, কেউ জামাতে আবার কেউ একাকি। পরবর্তীতে সবাইকে একসাথে নামাজ করে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা করা হয় কেননা নিরবিচ্ছিন্ন নামাজ পড়ার চেয়ে একসাথে সবাই নামাজ পড়াটা আরো সুন্দর।

তাবেঈ ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আনসারি (রহ.) বলেন, উমর (রা.) এক ব্যক্তিকে আদেশ করেন, তিনি যেন লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত পড়েন। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ২/২৮৫/৭৭৬৪

তাবেঈ ইয়াজিদ ইবনে রুমান (রহ.) বলেন, হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে লোকেরা রমজানে তেইশ রাকাত পড়তেন। -মুয়াত্তা মালিক, হাদিস: ৩৮০

হজরত আলী (রা.)-এর যুগ থেকে ২০ রাকাত তারাবিহ

বিখ্যাত তাবেঈ ইমাম আবু আবদুর রহমান সুলামি (রহ.) বলেন, হযরত আলী (রা.) রমজানে হাফেজদের ডাকেন এবং তাদের একজনকে লোকদেরকে নিয়ে বিশ রাকাত পড়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি বলেন, আলী (রা.) তাদের নিয়ে বিতর পড়তেন। -সুনানুল বাইহাকি: ২/৪৯৬-৪৯৭/৪২৯১

তাবেঈ আবুল হাসনা (রহ.) বলেন, আলী (রা.) এক ব্যক্তিকে আদেশ করেন, তিনি যেন লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবি পড়েন। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ২/২৮৫/৭৭৬৩

উপরোক্ত বর্ণনাগুলো সবগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এমন সাহাবিদের সময়ের কথা যাদেরকে আল্লাহর নবী জান্নাতের সার্টিফিকেট দিয়েছেন। আরও অন্যান্য বর্ণনাসমূহ এবং সাহাবি-তাবেঈনের সর্বসম্মতিক্রমে আমলের ভিত্তিতে এবং যুগ যুগ ধরে চলে আসা সম্মিলিত অবিচ্ছিন্ন কর্মের ভিত্তিতে আলেমদের অভিমত হলো বিশ রাকাত তারাবি সুন্নতে মোয়াক্কাদা। বিনা ওজরে এর কম পড়লে সুন্নতে মোয়াক্কাদা ছেড়ে দেওয়ার গোনাহ হবে।

বর্তামানে যারা আট রাকাত তারাবি নামাজ পড়ার জন্য অর্থাৎ মানুষকে আমল থেকে বিতাড়িত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে তাদের এক মাত্র দলিল হলো বুখারী শরীফের একটি হাদিস এবং এ হাদিসটি তারাবি নিয়ে নয় বরং এটি  তাহাজ্জুদ নামাজ নিয়ে।

হাদিসটি হলোঃ রমজানে ও রমজানের বাইরে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) চার রাকাত করে আট রাকাত পড়তেন। অথচ আমরা জানি, রমজানের বাইরে কোনো তারাবি নেই এবং তারাবির নামাজ হলো দুরাকাত করে।

তারাবির নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম

তারাবি নামাজের মাসায়ালা

মাসয়ালা: বিশ রাকাত তারাবির নামাজ বালেগ পুরষ-মহিলা সবার ওপর সুন্নতে মোয়াক্কাদা। অসুস্থ ও রুগী ব্যক্তির ওপর তারাবি জরুরি নয়, তবে কোনো কষ্ট না হলে তাদেরও পড়া মুস্তাহাব। -রদ্দুল মুহতার: ১/৭৪২

মাসয়ালা: তারাবির নামাজ জামাতে আদায় করা মুস্তাহাব, একাকি আদায় করলেও আদায় হয়ে যাবে। -বাদায়েউস সানায়ে: ১/২৯০

মাসয়ালা: প্রতি ২ রাকাত করে ৪ রাকাত নামাজ পড়ার পর বিশ্রাম নিবেন।বিশ্রামে দোয়া দুরুদ, তারাবী নামাজের দোয়া, এবং তারাবী নামাজের মোনাজাত রয়েছে এগুলো দিতে পারেন। কোনো কিছুই আপনার জন্য ক্ষতি হবে নাহ বরং তা পরকালে আপনার সম্পদ হবে। 

পড়ে আসুন তারাবি-নামাজের-দোয়া ও মোনাজাত

মাসয়ালা: কারো যদি তারাবির জামাত থেকে কিছু রাকাত ছুটে যায় তাহলে বেতরের নামাজের পর তা পড়ে নিবে। -রদ্দুল মুহতার: ২/৪৪

মাসয়ালা: নাবালেগ হাফেজের পিছনে বালেগ পুরুষ মহিলা কারো জন্যই ইক্তিদা করা বৈধ নয়। -মাজমাউল আনহুর: ১/১৬৭, হেদায়া: ১/২৩৮, আল বাহরুর রায়েক: ১/৩৫৯

মাহে রমজানের রাতে তারাবি নামাজ জামাতে আদায়ের জন্য ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা প্রতিদিন মসজিদে সমবেত হন। দেশের প্রতিটি মসজিদে একই পদ্ধতিতে খতমে তারাবি পড়ার লক্ষ্যে রোজার প্রথম ছয় দিন দেড় পারা করে ও পরে লাইলাতুল কদর পর্যন্ত বাকি ২১ দিন এক পারা করে তিলাওয়াত করা হয়।

সূরা তারাবী পড়লেও অনেক ফজিলত রয়েছে। রমজান মাস ফজিলতের মাস। আপনি ভালো যা করবেন তা আপনার জন্য ৭০ গুন বেশি সওয়াব হবে। আপনি একটি ভালো কাজ করবেন আল্লাহ আপনার জন্য ৭০ টি ভালো কাজের সওয়াব দিবেন।মানুষকে খাওয়ানো ইসলামের উত্তম কাহগুলোর মধ্যে অন্যতম। রমজান মাসে আপনি বেশি বেশি গরীব মিসকিনকে ইফতার করানোর চেষ্টা করবেন এবং এতে রয়েছে অফুরন্ত নেয়ামত।

Leave a Comment